১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ সকাল ১০:১৪

প্রসঙ্গ একশ বছরের রাজনীতি

সৌমিত্র দেব
  • আপডেট সময়ঃ বৃহস্পতিবার, জুন ১, ২০২৩,
  • 45 পঠিত

একশ বছরের রাজনীতি- নামে একটি বই লিখেছেন আবুল আসাদ । তিনি জামায়াতে ইসলামির মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক।[একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। শুরুতে কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিকে রাজশাহী সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করেছেন। ১৯৭০ সালে ১৭ই জানুয়ারী দৈনিক সংগ্রামে সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি সার্বক্ষণিক সাংবাদিক জীবনের শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পর্যন্ত প্রকাশিত তার গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস গ্রন্থ ‘কাল পঁচিশের আগে ও পরে’ এবং ‘একশ’ বছরের রাজনীতি’, ঐতিহাসিক ঘটনার চিত্রধর্মী গল্প ‘আমরা সেই সে জাতি’ ( তিন খন্ড ) এবং প্রবন্ধ সংকলন ‘একুশ শতকের এজেন্ডা’। তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম হলো সাইমুম সিরিজ। এ পর্যন্ত এই সিরিজের ৬৩ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছেন । ব্যক্তি জীবনে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে আমার অবস্থান যোজন যোজন দূরে হলেও অগ্রজ সাংবাদিক এবং লেখক হিসেবে আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি ।

আবুল আসাদের বই আমার খুব একটা পড়া হয় নি কখনো । তাঁর এই বইয়ের নাম দেখে পড়ার খুব ইচ্ছে হলো । হদিশ পেলাম ফেসবুকে। আমার এলাকার অগ্রজ সাংবাদিক সৈয়দ রুহুল আমিন এই বইটা নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছেন । সেখানে বিজ্ঞাপিত করা হয়েছে ,
১৭৫৭ সালে মুসলিমদের হাত থেকে বাংলাদেশের
শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেয় ইংরেজরা । ইংরেজদের
শাসনে হিন্দুরা হলো অনুগত প্রজা আর মুসলিম
হলো বিদ্রোহী । এইভাবে শুরু হলো শাসিতের
কাতারে দাঁড়ানো মুসলমান ও হিন্দুদের নতুন এক
রাজনীতি । বাংলা চৌদ্দ শতকের রাজনৈতিক
ঘটনাবলী এই রাজনৈতিরই উত্তরাধিকার ।
এই টুকু পড়েই আমি চমকে উঠলাম। ইংরেজদের
শাসনে হিন্দুরা হলো অনুগত প্রজা ? তাহলে সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা করলো যে মঙ্গল পান্ডে এই বিদ্রোহী লোক কে ? মন কে প্রবোধ দিলাম মঙ্গল পান্ডে তো ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ করেছেন , আর লেখক এখানে তার অনেক পরের একশ বছরের ইতিহাস লিখেছেন ।
কিন্তু বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তো এই একশ বছরের ভেতরের ঘটনা । লর্ড কার্জন কোলকাতা শহরে পা দিয়েই বুঝলেন প্রেসিডেন্সী কলেজের হিন্দু ছাত্ররা খুব বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এদের সাইজ করতে হলে ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি লাগবে । মানে বাংলাকে ভাগ করতে হবে । তাই হল ১৯০৫ সালে । বাংলাকে ভাগ করে দেয়া হলো । এর বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠলো , তার নেতৃত্বে কারা ছিল ? হিন্দুরা । ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে গেলো যে কিশোর বিপ্লবী । কে সে, ? একজন হিন্দু । চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন করলো যে সূর্য সেন,তিনিও একজন হিন্দু । জাপানের সহযোগিতায় সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে যিনি ভারত স্বাধীন করতে চাইলেন সেই রাসবিহারী বসু একজন হিন্দু । আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের মাধ্যমে ভারত স্বাধীনের উদ্যোগ নিলেন যে নেতাজি সুভাষ বসু, তিনি ও তো জন্মসূত্রে হিন্দুই ছিলেন ।
অন্যদিকে সব মুসলমান কি বিদ্রোহী ছিল ? তাহলে কাশিমবাজার কুঠি আর আহসান মঞ্জিলে ষড়যন্ত্রের ইতিহাস কি মুছে যাবে ? বিদ্রোহী সিপাহীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ঢাকার লবণ ব্যবসায়ী এক মুসলমান পরিবার ।সিপাহীদের ফাঁসি দেয়া হলো । আর লবণ ব্যবসায়ী পরিবারকে দালালির পুরস্কার হিসেবে ইংরেজরা নবাব উপাধি দিল । ইংরেজ অনুগত সেই নবাব দের বাড়িতেই জন্ম হল ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের ।
এ সব ভারতীয় প্রচারণা নয় । বাংলাদেশের পাঠ্য বইতেই খুঁজে পাবেন।

তার মানে কি আবুল আসাদ সাহেব মিথ্যা বলেছেন ? ইতিহাসের নামে তথ্য বিকৃত করেছে? তা ও নয় । ইংরেজদের শাসনে অনেক হিন্দু অনুগত ছিলেন । তারা জমিদারি পেয়েছেন । খেতাব পেয়েছেন । সরকারি চাকরিতে বড় বড় পদ পেয়েছেন । কিন্তু সব হিন্দু জমিদার ছিলেন না । সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না । সবাই খেতাব ও পান নি । লেখক এখানে পরিমিতি বোধের অভাবে সরলীকরণ করেছেন ।

এক ই ভাবে বিদ্রোহী মুসলমান তো ছিলই । দু চারটা বাদ দিলে ব্রিটিশ বিরোধী সকল আন্দোলনেই মুসলমান দের ভুমিকা ছিল অবদান ছিল । হাজী শরিয়ত উল্যা, তিতুমীর ,নূরলদীন কত নাম । বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দুদের পাশাপাশি ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল । এমনকি সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজেও বীরত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন মুসলমানেরা । এখানেও বলতে হবে , সব মুসলমান বিদ্রোহী ছিলেন না । বরং বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ রা যে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করতো তাদের অহিকাংশ ছিলেন মুসলমান । ব্রিটিশ আমলের শেষ ভাগে ব্রিটিশ পুলিশের আইজিপি পদ অলংকৃত করেছেন খুলনার কজি আনোয়ারুল হক ।

প্রকৃত পক্ষে এ দেশে ব্রিটিশ বিরোধী ১০০ বছরের ইতিহাস হলো হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত ইতিহাস । ইংরেজ অনুগত হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যথেষ্ট মহাব্বত ছিল । আবার বিদ্রোহী হিন্দু মুসলমানের মধ্যেও ঐক্য ছিল । কোন সাম্প্রদায়িক লেখকের পক্ষে সেই সত্য তুলে ধরা সম্ভব নয়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্ব প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন ফকির আর সন্যাসীরা । ফকিরের নেতা ছিলেন মাদারিয়া সুফি মতের পীর ্মজনু শাহ । সন্যাসীদের নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক । দু দলকেই পেছন থেকে সাহায্য করতেন নাটোরের রাণী ভবানী । পরবর্তীকালে সিপাহী যুদ্ধে হিন্দু মুসলমান সকলেরই অংশ গ্রহণ ছিল । এমনকি গত শতকের বিশের দশকে মুসলমানদের খেলফত আন্দোলনের সঙ্গেও যোগ দিয়েছিল হিন্দুরা । নাম দেয়া হয়েছিল খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ।

তাহলে এই সম্প্রীতি নষ্ট করলো কে ? ইংরেজ রা এই দেশ ছাড়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশে দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়া হলো । ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হলো ভারত । একশ বছরে এই প্রথম রোপন করা হলো সাম্প্রদায়িকতার বিষ বৃক্ষ । কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বেশীদিন সেটা মানলো না । দুই যুগ পার না হতেই ১৯৭১ সালে জন্ম নিলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।

একশ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় ঘটনা ।

 

সৌমিত্র দেব : প্রধান সম্পাদক , রেডটাইমস

সংবাদটি শেয়ার করুন ...

এই বিভাগের আরো সংবাদ...
© All rights reserved © ২০২৩ স্মার্ট বরিশাল
EngineerBD-Jowfhowo