১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ সকাল ৮:৫৯

বরিশালে জলাবদ্ধতা নিরসনের পথ নেই!

বিশেষ প্রতিবেদক:-
  • আপডেট সময়ঃ বুধবার, আগস্ট ৯, ২০২৩,
  • 120 পঠিত

উঁচু জোয়ার আর সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবছে বরিশাল নগরী। ১০ বছরের বেশি সময় চলছে এই পরিস্থিতি। এর আগে নগর তলানোর এমন দৃশ্য আর কখনো দেখেনি কেউ। আটাশির ভয়াবহ বন্যায়ও পানি ওঠেনি এখানে। যেমনটা ওঠেনি সত্তরের জলোচ্ছ্বাসেও। সামান্য বৃষ্টিতেই কেন ডুবছে নগর, এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বারবার অভিযোগের আঙুল উঠেছে নগর ভবনের দিকে। একসময় নগরজুড়ে থাকা খালগুলো হত্যা করে বানানো হয়েছে সরু ড্রেন। সেই ড্রেনের ওপর আবার স্টল করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসবের নেপথ্যে ছিল শতকোটি টাকার বাণিজ্য। বিভিন্ন সময় নগরপিতার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক নেতারা করেছেন এই কাজ। যার মাশুল গুনছে এখন নগরের মানুষ।

সামান্য বৃষ্টিতেও ব্যস্ত সড়কে জমে যাচ্ছে পানি। কিছু কিছু এলাকায় স্থায়ী রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতা। বরিশালকে একসময় বলা হতো ‘প্রাচ্যের ভেনিস’। নগরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত ছোট-বড় খালের কারণেই ছিল এই নামকরণ। তখন নগরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেতে এসব খালে নৌকায় চড়ত মানুষ। তখন অবশ্য নগরী ছিল না বরিশাল। ছিল দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভা।

সংস্কৃতিকর্মী শুভঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, লাল সুড়কির প্রায় সব সড়কের পাশ দিয়েই এখানে বইতো খাল। ইতিহাস বলে, বড় আকৃতির ২৪টি খাল বইতো এই শহরে। সেই সঙ্গে ছিল এসব খালের অসংখ্য ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা। তখন শহরের আকৃতি বেশি বড় ছিল না। পৌর এলাকার আয়তন ছিল মাত্র ২৫ বর্গকিলোমিটার।

নগরের বগুড়া রোড এলাকার বাসিন্দা ডা. খ ম জিল্লুর রহমান বলেন, এসব খালে চলত গয়নার নৌকা। তাতে চেপে দূর-দূরান্তে যাত্রা করত মানুষ। বর্তমানের বগুড়া রোড, বটতলা, সদর রোড, সিএন্ডবি সড়কের পাশে থাকা খালে জোয়ারের সময় থাকত থইথই পানি। সব খালের সংযোগ ছিল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলাসহ অন্য নদীগুলোর সঙ্গে।

বটতলা এলাকার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব জয়নাল ব্যাপারী বলেন, মানুষের যাতায়াতই কেবল নয়, পণ্য আনা-নেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতো এসব খাল। নৌকায় করে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য আসত বটতলা বাজারে।

অন্য বাজারগুলোর সঙ্গেও ছিল খালের সংযোগ। বলা যায়, খালকেন্দ্রিক যোগাযোগের সুবিধা মাথায় রেখেই গড়ে উঠেছিল শহরের প্রায় সব হাটবাজার।

২০০২ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠিত হয় বরিশাল সিটি করপোরেশন। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম নির্বাচন। জয়ী হয়ে নগরপিতার আসনে বসেন তৎকালীন হুইপ ও সংসদ-সদস্য, বিএনপির বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। এরপর থেকেই মূলত মৃত্যু ঘটতে শুরু করে নগরের খালগুলোর। যার প্রথম বলি হয় হাজার বছরের পুরোনো বটতলা খাল। খালটি ভরাট করে তৈরি করা হয় সরু ড্রেন। এই ড্রেনের ওপর বটতলা বাজারসংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয় তিনতলাবিশিষ্ট লম্বা ভবন। ভবনের নিচতলায় ভাড়া দেওয়া হয় স্টল। দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা ভাড়া দেওয়া হয় অফিস হিসাবে। সেসময় এই খাল ভরাটের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করলেও তা কানে তোলেননি নগর ভবনের কর্তাব্যক্তিরা।

পরবর্তী সময়ে একইভাবে খাল ভরাট করে স্টল আর ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ভাড়া দেওয়ার বাণিজ্যে একের পর এক খুন হতে থাকে বাকি খালগুলো। একসময় মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইতিহাস হয়ে যায় জিলা স্কুল খাল, ভাটার খাল, বগুড়া রোড খাল, নাপতার খাল, ভাটিখানা খাল, ব্যাপ্টিস্ট মিশন খাল, চানমারীর খাল, নতুনবাজার খালসহ নগরের বাকি প্রায় সব খালের অস্তিত্ব।

খাল হত্যার কফিনে সর্বশেষ পেড়েকটি ঠোকা হয় আওয়ামী লীগের মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরনের সময়ে। তখন সার্কিট হাউজের পাশে থাকা খালটি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে সেই কাজটি করে নগর ভবন।

২৪ খালের নগর বরিশালে বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে জেল খাল, লাকুটিয়া খাল, সাগরদি খালসহ হাতে গোনা ৩-৪টি খালের ধারা। অবশ্য এগুলোও এখন মৃতপ্রায়। নগর ভবন ভরাট না করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের আগ্রাসি দখল আর বেপরোয়া ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার দশায় এসব খাল।

নগরের বাসিন্দা বিশিষ্ট সাহিত্যিক বুলবুল আহসান বলেন, প্রতিটি খাল ভরাটের সঙ্গে ছিল স্বার্থান্বেষী মহলের বিপুল অঙ্কের অর্থবাণিজ্য। আমরা যখন খাল ভরাটের প্রতিবাদ করেছি, তখন তারা বলেছেন নগর ভবনের আয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা। ভাটির নগর বরিশালে এভাবে পানি জমে জলাবদ্ধতা হতে পারে, তা আমরা কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে নগরী।

আহসানের কথার বাস্তব চিত্র এখন বরিশালে। রোববার দুপুর ১২টার আগের ২৪ ঘণ্টায় এখানে ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহওয়া বিভাগ। এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নগরের প্রায় সব ব্যস্ত সড়ক। বটতলা এলাকার সড়কে জমেছে ৩ থেকে ৪ ফুট পানি। একই চিত্র বগুড়া রোড, সদর রোড, বাংলাদেশ ব্যাংক সড়ক, নবগ্রাম রোড এলাকায়। বহু এলাকায় মানুষের ঘরে পর্যন্ত ঢুকেছে পানি। এর আগে চলতি সপ্তাহের ১, ২, ৩, ৪ ও ৫ আগস্ট যথাক্রমে ২৪, ১৩.৬, ৪২.২, ৩৭ ও ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিতেও তলিয়ে যায় নগরীর বহু এলাকা। বড় দুর্ভোগের বিষয় হচ্ছে কখনো কখনো এই পানি ৩-৪ দিনেও নামছে না।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমেজ অ্যান্ড ইনফরমেশনের পরিচালক হাসান আবিদুর রেজা বলেন, নগরে থাকা ২৪টি খাল ছিল প্রাকৃতিক রিজার্ভার। অতিবৃষ্টি কিংবা নদীতে আসা অস্বাভাবিক উঁচু জোয়ারের পানি বুকে ধারণ করে শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাত তারা। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এসব খালের ছিল প্রাকৃতিক নিয়মের নিজস্ব নেটওয়ার্কিং। ফলে জলাবদ্ধতা তো দূরের কথা, শহরবাসীর ফেলা ময়লা-আবর্জনাও আটকাত না খালে। সেই খাল আমরা হত্যা করেছি। এখন সরু ড্রেন আর নদীতে উঁচু হয়ে আসা জোয়ারের কারণে সেই পানি সহজে নামছে না। খাল উদ্ধার যেমন আর সম্ভব নয়, তেমনই সম্ভব নয় বাড়তি পানি ধারণের নতুন কোনো ব্যবস্থা করা। এখন কী করলে নগর জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে, তা কেবল পানি বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন ...

এই বিভাগের আরো সংবাদ...
© All rights reserved © ২০২৩ স্মার্ট বরিশাল
EngineerBD-Jowfhowo