১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ রাত ১০:০৮

বরিশাল-ভাঙ্গা মহাসড়কে মৃত্যু মিছিল..! নিহত শতাধিক বিগত আটমাসে

আরিফ আহমেদ
  • আপডেট সময়ঃ সোমবার, আগস্ট ১৪, ২০২৩,
  • 130 পঠিত

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥

বরিশাল থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। গত আটমাসে এই মহাসড়কে দূর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শতাধিক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধু গৌরনদীতেই ৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এখানে আশুকাঠী থেকে ভূরঘাটা সড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করেন তারা। গৌরনদীতে সড়ক দুর্ঘটনার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২৫ জুলাই মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলারআশোকাঠী এলাকায় দুই পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ইলিশ পরিবহনের একটি যাত্রিবাহী বাস উল্টে ডোবায় পড়ে যায়। এতে নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ২০জন আহত হয়। এর একদিন পরই ২৬ জুলাই মহাসড়কের মাহিলাড়া এলাকায় বাস-কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। গত ২ আগষ্ট মহাসড়কের আশোকাঠী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এনা পরিবহনের বাস উল্টে পুকুরে পড়ে যায়। এসময় বাসের চাঁপায় এক মোটরসাইকেল চালকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এঘটনায় বাসের কমপক্ষে ১২ যাত্রী আহত হয়।

গত ৫ আগষ্ট মহাসড়কের ইল্লা-ভূরঘাটার মধ্যবর্তী এলাকায় যাত্রিবাহী বাস ও ট্রাক্টর দিয়ে তৈরি অবৈধ ট্রলির সংঘর্ষে বাসযাত্রী এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং বাসের ১০ যাত্রী আহত হয়। সর্বশেষ গত ৬ আগষ্ট রাত আটটার দিকে মহাসড়কের কসবা এলাকায় নসিমন-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তিনজন আহত হয়। এরমধ্যে দুইজনকে আশংকাজনক অবস্থায় বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। একই দিন দিবাগত ভোররাতে আশোকাঠী এলাকায় মালামাল বোঝাই একটি মিনি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে যায়। তবে এতে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হাইওয়ে পুলিশের হিসেবে গত ৮ মাসে নিহতের সংখ্যা ১৭ জন।
বরিশালে সর্বশেষ গত শনিবার সাকুরা পরিবহনের চাপায় উজিরপুরে একজন ইজিবাইক চালক নিহত হয়েছেন। উজিরপুরে গত আটমাসে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০জন বলে দাবী স্থানীয়দের। তবে উজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, এ পরিসংখ্যান এখন হাইওয়ে পুলিশের কাছে। কারণ হাইওয়ের মামলাগুলো এখন হাইওয়ে থানার দায়িত্বে। আর হাইওয়ে পুলিশের তথ্যের সাথে বেসরকারি সংস্থার তথ্যের অনেক পার্থক্য রয়েছে বলে জানান বরিশালের বাসদ নেত্রী মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, আমরা এ তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছি, তবে তা এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। এটা নিশ্চিত গত আটমাসে বরিশাল ভাঙ্গা মহাসড়কে শুধু শতাধিক নয় তার চেয়েও বেশি মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন। এটা যাত্রী কল্যাণ সংস্থা বা সমিতি ভালো বলতে পারবে। তাই তাদের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন মনীষা।

আর যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক জানালেন, বরিশাল আলাদা করা নেই তবে গত আটমাসে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ৩ হাজার ৫২৯টি। এতে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৬৯৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৩০০ জন।তিনি আরো বলেন, অতিরিক্ত গতি এবং ফিটনেসবিহীন গাড়িই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করছেন তারা।

বরিশাল-কুয়াকাটা, ঝালকাঠি, ভাঙ্গা ও মাদারীপুরের শিবচরে গত আটমাসে শতাধিক নিহতের পরিসংখ্যান রয়েছে যাত্রী পরিবহন সংস্থার কাছে। এদের মধ্যে ডাক্তার, কলেজছাত্র, পুলিশসহ মৃতের সংখ্যা অনেক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কি অবস্থা সে খোঁজ কেউ না নিলেও প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, বরিশাল থেকে ভাঙ্গা মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়েছে। হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলছেন, মাওয়া থেকে স্প্রীডওয়েতে ভাঙ্গা পর্যন্ত এসেই দুই লেনের সড়কের সাথে সামঞ্জস্য  রাখতে পারে না বেশিরভাগ চালক। এরউপর কিছু চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সড়ক বিশ্লেষকরাও।

বরিশালে সর্বশেষ বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে ঝালকাঠির ছত্রকান্দায়। ১৭ জনের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ২১ জুলাই এই দুর্ঘটনায় আহত হয় আরো ১৮ জন। রাজাপুর উপজেলার ছত্রকান্দা এলাকায় খুলনা-ঝালকাঠি সড়কে ঘটে এই দুর্ঘটনা।দুর্ঘটনাকবলিত বাশার স্মৃতি পরিবহনের বাসটি ভান্ডারিয়া থেকে ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ছত্রকান্দায় পৌঁছার পর বাসটির চাকা ফেটে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান এবং বাসটি উল্টে রাস্তার পাশের পুকুরে পড়ে যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সড়ক দুর্ঘটনা তথ্য সংরক্ষণ নথিতে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চালকের অসাবধানতায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পুকুরে পড়ে যায়। এর আগে মাদারীপুরের শিবচরেও বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

একটি উন্নয়ন সংস্থা থেকে প্রদত্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০২২ সালে বরিশাল জেলায় ১৬৮ দুর্ঘটনায় ১৮৩ জন মারা গেছে। ২০২২ সালে বরিশাল বিভাগের সব জেলায় দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বেড়েছে। গতবছর বরিশাল জেলায় ১৬৮ দুর্ঘটনায় ১৮৩ জন মারা গেছে। ভোলায় ৪৮ দুর্ঘটনায় ৪৪ জন, ঝালকাঠিতে ২২ দুর্ঘটনায় ২৪ জন, পটুয়াখালীতে ৫২ দুর্ঘটনায় ৫৩ জন, পিরোজপুরে ৪৭ দুর্ঘটনায় ৫৪ জন এবং বরগুনায় ৪৫ দুর্ঘটনায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়।

বরিশাল সাহিত্য সংসদ এর দায়িত্বরত সভাপতি ও সামাজিক আন্দোলনের নেতা কাজী মিজানুর রহমান বলেন, সবার আগে বরিশাল থেকে ভাঙ্গা দ্রুত ফোরলেন সম্পন্ন করা এবং একই সাথে প্রতিটি যানবাহনে গতি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা করতে হবে। টার্নিং পয়েন্টগুলো রাতে আলোক সরবরাহ ও সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখতে হবে। দ্রুত গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ এটা নিশ্চিত। তাই গতিসীমা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে জানান মিজানুর রহমান।

সংবাদটি শেয়ার করুন ...

এই বিভাগের আরো সংবাদ...
© All rights reserved © ২০২৩ স্মার্ট বরিশাল
EngineerBD-Jowfhowo